সিলেটকে পর্যটন শূন্য করার পাঁয়তারা, সড়ক–রেল–আকাশপথে একযোগে ভোগান্তি
ইমরান আহমদ, সিলেট থেকে:সিলেটের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক, রেল ও আকাশপথ—তিন দিকেই পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ আকার নিয়েছে যে, সিলেটবাসী মনে করছেন অঞ্চলটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন খাত, প্রবাসী যাতায়াত এবং সিলেটনির্ভর নানা ব্যবসা-বাণিজ্য।
সিলেট-ঢাকা সড়ক: উন্নয়ন কাজের চেয়ে ভোগান্তি বেশি** ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক ছয় লেন করার প্রকল্প কয়েক বছর ধরে চলছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং পরিকল্পনাহীন খোঁড়াখুঁড়িতে সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসহনীয় যানজট।
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, ভৈরববাজার, শাহবাজপুর—একাধিক স্থানে একই সময়ে খননকাজ চলায় পথজুড়ে তৈরি হয়েছে সংকীর্ণ লেন। কোথাও কোথাও কাঁচা ডাইভারশন, আবার কোথাও বড় বড় গর্তের কারণে যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে যাচ্ছে। ঢাকা যেতে আগে যে সময় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগত, এখন তা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায়ও গড়ায়। রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। চিকিৎসা, আদালত, অফিস বা জরুরি কাজ নিয়ে ঢাকায় যাওয়া সিলেটবাসীর জন্য এই রুট এখন মানসিক চাপের সমান। সড়কের এই অচলাবস্থা শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, পর্যটন ও বাণিজ্যিক পরিবহনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ী পণ্য পরিবহণে দীর্ঘ বিলম্ব ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
রেলপথে বিশৃঙ্খলা—টিকিট পাওয়া কঠিন, ভ্রমণ আরও কঠিন** রেলপথ একসময় সিলেটবাসীর নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ছিল। এখন রেল ভ্রমণ নিত্যদিনের ভোগান্তির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে টিকিট পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে; নির্ধারিত সময়ের আগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এতে সপ্তাহ–দশ দিন আগেও আসন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ট্রেনে যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের অভাব স্পষ্ট। সিটের তুলনায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হওয়ায় বগির ভেতর হাঁটা-চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ভিড়ে সিটধারীরাও স্বস্তিতে থাকতে পারেন না। এর মধ্যেই হকারদের অবিরাম চলাচল বগিকে আরও বিশৃঙ্খল করে তোলে। একইসঙ্গে ভিক্ষুক ও হিজড়াদের সারিবদ্ধভাবে পুরো বগি ঘুরে বেড়ানো যাত্রীদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেলক্রসিংগুলোর আধুনিকায়ন না হওয়ায় ট্রেনকে যেখানে–সেখানে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে যাত্রাসময় বাড়ছে এবং সময়ানুবর্তিতা ভেঙে পড়ছে। সব মিলিয়ে সিলেট রুটে রেল ভ্রমণ এখন ঝুঁকিপূর্ণ, অস্বস্তিকর ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
আকাশপথেও স্বস্তি নেই:
সিলেট বিমানবন্দর প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ভরসার জায়গা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট–ঢাকা–সিলেট রুটে বিমানের ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যগামী প্রবাসীরা উচ্চ ভাড়ার কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ভার গুনছেন। লন্ডন–সিলেট রুটে যাত্রীরা সরাসরি ফ্লাইটের অভাবে ঢাকায় গিয়ে আবার সিলেটে ফিরতে বাধ্য হন। ফলে টিকিট খরচ ও ভ্রমণ সময়—দুটিই দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য এটি গুরুতর চাপ তৈরি করেছে।
পর্যটনে ধস নেমেছে—হোটেল, রিসোর্ট ও ব্যবসা হুমকিতে** সিলেটের পর্যটন শিল্প দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। জাফলং, রাতারগুল, বিসনাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, মাধবকুণ্ড, লালাখাল, শ্রীমঙ্গল—সবচেয়ে বেশি ভ্রমণকারী আসে ঢাকা থেকেই। কিন্তু সড়ক–রেল–আকাশপথের জটিলতায় পর্যটন শিল্প ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। জাফলংয়ে পর্যটক আগমন আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
রাতোগুলে নৌকা ভাড়া, ভোলাগঞ্জে সাদা পানির স্পট, লালাখালের নৌভ্রমণ—সব জায়গাতেই ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা দিন কাটাচ্ছেন অলস সময়ে। হোটেল, রিসোর্ট, গাড়িভাড়া, রেস্টুরেন্ট, ক্রাফট শপ—সবখানেই দেখা যাচ্ছে মন্দাভাব। মৌসুমেও যেখানে বুকিং পাওয়ার কথা কঠিন হওয়ার কথা, সেখানে ঘর খালি পড়ে আছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যোগাযোগব্যবস্থা ঠিক না হলে সিলেটের পর্যটন শিল্প আগামী কয়েক বছর ধরে ধাক্কা খেতে থাকবে।
সিলেটবাসীর প্রশ্ন: তিন রুটেই একই সময়ে সংকট কেন? সিলেটবাসীর সাধারণ অভিমত—সড়ক, রেল ও আকাশপথে একই সঙ্গে সংকটের সৃষ্টি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার বড় উদাহরণ।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, রেলপথে আধুনিকায়নের অভাব এবং আকাশপথে পর্যাপ্ত ফ্লাইট না থাকা—সব মিলিয়ে সিলেটের অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগাযোগব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন— ছয় লেন প্রকল্পের কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা, বিকল্প লেন নিশ্চিত করা; রেলক্রসিং আধুনিকায়ন; টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা; বগির নিরাপত্তা বৃদ্ধি; এবং সিলেট রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো।
এ ছাড়া পর্যটন খাতকে পুনরুদ্ধারে সরকারি তদারকি ও প্রচারণাও জরুরি। সিলেট শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল নয়—এটি পর্যটন, প্রবাসী আয়ের কেন্দ্র এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঢাকা–সিলেট যোগাযোগব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রাকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত সংস্কার ও স্থায়ী সমাধান না হলে সিলেটের পর্যটন ও অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন।



































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































































